অদ্ভূত এক অস্থির জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি এখন। এখানে দৈনন্দিন ক্যালেন্ডার আছে, আছে নানারকম পুজো পার্বণের হিসেব, রাশি, তিথি, নক্ষত্রের অবস্থান। কিন্তু দেখার সময় নেই। যদিও বা তা ভুলবশত জেনে ফেলি তাহলেই বা কি করার আছে? একা কোন উৎসব পালনে আনন্দ হয়, নাকি একা একা কেঁদে দুঃখ দূর হয়? এতদিন অফিসের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ওসব মনে রাখার উপায় ছিল না। হাজার লোকের আনাগোনা, তাদের অফিসিয়াল বা আনঅফিসিয়াল কথায় বিরক্তি প্রকাশ না করে মুখে মোনালিসা মার্কা হাসি ঝুলিয়ে রাখা, রং নম্বরের ফোন হলেও তা এটেন্ড করা তো ছিলই; বাকী সময়েও রেহাই ছিল না। অনর্গল এবং অহরহ ফোনাঘাত। মাঝে মাঝে ভয় লাগত , পরশুরামের কুঠারের মত মোবাইলের হ্যান্ডসেটটা আমার হাতে পার্মানেন্টলি সেঁটে যাবে না তো? কানও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল হোয়াটস অ্যাপের ম্যাসেজ আসার টুং টুং আওয়াজ শুনতে। কিছুক্ষণ আওয়াজ না এলে অস্বস্তি হত। বারবার মোবাইলটা তুলে স্ক্রিনটায় চোখ বুলিয়ে নিতাম। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে অজান্তেই হাত চলে যেত মোবাইলে। চোখ যেত মোবাইলের স্ক্রিনে। তারপর দিন শুরু। হাঁফিয়ে ওঠার কারণে অথবা এই অস্থিরতা না বরদাস্ত করতে পারার কারণে স্বেচ্ছাবসর নিলাম। জয় গোস্বামীর মেঘবালিকার খোঁজে যাওয়া কবির মত ইচ্ছা ছিল, "এক পৃথিবী লিখব আমি.....একাই থাকবো, একাই দুটো ফুটিয়ে খাবো/ দু এক মুঠো ধূলোবালি/ যখন যারা আসবে মনে তাদের লিখবো/ লিখেই যাবো/ এক পৃথিবীর একশো রকম স্বপ্ন দেখার সাধ্য থাকবে যেই রূপকথার/ সেই রূপকথা আমার একার।" না, হয় নি তা। এমন এক অস্থির সময়ের চক্রব্যুহে ঢুকে পড়লাম যে জীবনেই আর পদ্যের ছোঁয়া রইল না। একটা কথা তবে সত্যি। লেখা হয়ত হয় নি, তবে একা থাকা শিখিয়ে দিয়েছে এই জীবন। এই অস্থির সময় দেখিয়ে দিয়েছে, মানব সমাজ কত আত্মকেন্দ্রিক, কত স্বার্থসুখবিলাসী। বুঝেছি, আমার মত মানুষজনের খুব বিপদ। চেনা পরিচিত লোকজনেরও যে আমার সাথে সাথে বয়স বাড়ছে, বুঝতেই পারিনা। অস্থির হোক বা না হোক, সময় তো আর থেমে থাকে না। সুতরাং, আগে লোকজনের সাথে যে ভাবে কথা বলতাম সে ভাবে এখন কথা বলতে গেলে তারা শুনবে কেন? তাদের হয়ত তাতে ইগো বা প্রেস্টিজ আহত হয়। আমি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে আরম্ভ করলাম। উদাহরণ দিলে বোধহয় ঠিকঠাক বোঝাতে পারব। আমার একটা মুদ্রাদোষ আছে। বন্ধু বান্ধব বা জুনিয়রদের আদর করে বা ভালোবেসে "ছাগল" বলা। কোনোদিন রেগে কাউকে ছাগল বলেছি বলে মনে করতে পারছি না। তো, ভ্রাতৃপ্রতিম একজনকে বেশ কিছুদিন আগে বলেছিলাম "কি রে ছাগল, এই অস্থির সময়ে কেমন আছিস?" তার উত্তরে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সে বলেছিল "যথেষ্ট বয়স হয়েছে, ছাগল টাগল বলবেন না"। ব্যাপারটা তরল করার জন্য হেসে বলেছিলাম "আমার তো বয়স হয়নি রে!" সে আরও গম্ভীর হয়ে বলেছিল, "আমার বয়স হয়েছে।" প্রমাদ গুনেছিলাম। এই রে, ভায়েরা সব বড় হয়ে গেছে যে! আবার উল্টো চিত্রও আছে। অনেকক্ষণ ফোনে বকবক করার পর এক স্নেহভাজন খুব দুঃখ দুঃখ স্বরে বলল, "স্যর আপনি কি ভাল নেই? একবারও আদর করলেন না তো? "আমি ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে থাকায় সে বলল,"একবারও ছাগল বললেন না, স্যর। ওটা না শুনলে যে মনে হয়, ভালবাসছেন না।" তখন মনে হল, সময় অস্থির হলেও ভালবাসা বোধহয় স্থির হয়েই আছে। শুধু পরিমাপের এককটা পাল্টেছে। সেটাও ব্যক্তি বিশেষে।
{link}
এখন কারোর বাড়িতে যাওয়ার চল নেই। যদিও কোন বিশেষ কারণে যেতে হয়, তাহলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন হস্তশুদ্ধির। দরজা খোলার পরেই দূর থেকে স্যানিটাইজার স্প্রে দু হাতে ছড়িয়ে দেওয়াই বিধেয়। এমনভাবে দুহাত পেতে থাকতে হয় যেন কোন অমূল্য দানগ্রহণ করছি। এরপরেও যে খোলামেলা কথা হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। মুখে কাপড়ের অর্গল তো আছেই, সময় হৃদয়ও সংকুচিত করে দিয়েছে। কতক্ষণে কথা শেষ হবে তার অপেক্ষায় দু পক্ষই। একই চিত্র আমার বাড়িতে কেউ এলেও। কারোর জন্যই কারোর সময় নেই। এমনকি শিশুদের জন্যও বাবা মা অথবা পরিবারের কারোর সময় নেই। এই সববন্ধের সময়ে তাদের ইস্কুলে যাওয়া, হৈ হৈ করা ভোলাতে একমাত্র হাতিয়ার তাদের হাতে মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া। তারাও অন্তর্জালের জগতে ঢুকে পড়ে শৈশব হারাচ্ছে। কৈশোর আসার আগেই কিশোর/কিশোরী হয়ে যাচ্ছে। আমার চাকরি জীবনের মত হাতে সবসময় মোবাইল তাদের। দুই থেকে দুই বিয়োগ করলেও হাতে মোবাইল থেকেই যাচ্ছে। কাকে দোষ দেওয়া যাবে? অস্থির সময়কে নাকি আমাদের অস্থির মানসিকতাকে? উত্তর জানা নেই। কোন মূল্যবোধই যে তাদের হাতে তুলে দিতে পারছি না আমরা!
{ads}