header banner

উপলব্ধিঃ মার্কেটিং- নিখিল কুমার চক্রবর্তী

article banner

উপলব্ধি 
(মার্কেটিং)

আমাদের বড়বেলায় (বুড়োবেলায় নয়) মার্কেটিং বলতে এম বি এ কোর্সের একটা শাখাকে বুঝতাম। জেনেছিলাম, বাজার সংক্রান্ত পড়াশোনা হয় সেই শাখায়। মনোপলি মার্কেট, কম্পিটিটিভ মার্কেট ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সব মার্কেটে দ্রব্যের মূল্য কিভাবে ঠিক করা হবে, কখন দ্রব্য বাজারে নিয়ে যেতে হবে -- এই সব ব্যাপার না কি পড়ানো হয় সে শাখায়! আরো অনেক কিছু নিশ্চয়ই পড়ানো হয়। তবে সে সবে গুরুত্ব দিতাম না। মার্কেটিং ব্যাপারটা নিয়ে এত গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় সেটা ছিল না তখন। পাকাবেলায় এসে নিজে কস্টিং পড়তে গিয়ে জানলাম মার্কেটিং এত সহজ বিষয় নয়। মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টকে তখন একটু অন্য চোখে দেখতে আরম্ভ করলাম। আরো বিশদে জানার চেষ্টা করলাম। আসলে তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি যে মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টটাই বর্তমান সমাজে আসল ম্যানেজমেন্ট। সেটা বুঝতে বুঝতেই মাথায় চকচকে টাক। যাই হোক, জানতে জানতেই কস্টিং কমপ্লিট হয়ে গেল। সবাই ভাবল আমি মার্কেটিং ব্যাপারটায় খুব দক্ষ হয়ে গেছি। কিন্তু আমি তো নিজেকে চিনি। বাজারের থলি হাতে বেরুলেই বুঝতে পারি, মার্কেটিংয়ের "ম" ও জানি না। পুঁই শাক কিনলে যে সাথে কুমড়ো কিনতে হয় তা মাথায় থাকে না। শুক্তোর বাজার করতে গৃহিণী ঠেলে পাঠালে হয় উচ্ছে না হয় কাঁচা কলা আনতে ভুলে যাবই। দামের কথা না ই বা বললাম। সব্জি বিক্রেতা আমার থেকে ভাল মার্কেটিং বোঝে। আমাকে দেখেই বলে উঠে, "আসুন দাদা, কত দিন পরে এলেন। শরীর ভাল তো? বাড়ির সবাই ভাল তো?" আমি গদগদ হয়ে যাই। কি ভাল লোক! আমার কত খেয়াল রাখে! সে আবার বলে, "পটল এক কিলো দিচ্ছি দাদা। হাজিগড়ের মাঠের টাটকা পটল। আপনি তো জানেন আমরা নিজেরাই চাষ করি। সত্তর টাকা কিলো বেচছি। আপনি ষাট করে দেবেন।" খুব খুশী হয়ে পটল কিনে বাড়িতে ফিরে গৃহিণীকে সব বলতেই খাঁটি সরষের তেলের ঝাঁঝ বেরিয়ে আসে। "ঐ ছেলেটার বাড়ি হাজিগড়ে? নিজেরা চাষ করে? তোমাকে ঢপ দিল আর তুমি মেনে নিলে? ওর বাড়ি তো এই বর্ধমানেই। মেহেদিবাগানে। বাপের জন্মে কোনদিন চাষের মাঠে পা দিয়েছে?" এর পর দাম শুনে আরো উগ্র ঝাঁঝ। "সে কী গো? আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া গলা কাটা সব্জির ভ্যানবালাগুলোও তো অত দাম নেয় না। পঞ্চাশ টাকা কিলো নেয়। হায় হায়! কি একটা গাড়োলের সাথে যে বাবা আমার বিয়ে দিয়েছে!" এর পরে স্বভাবতই স্থান ত্যাগ করা উচিত। এবং আমিও "সাকসেসফুল রিট্রিট" করি। কি যে হয় আমার! পরের বার বাজার গিয়ে আবার তার কাছে যাই। আবার সব্জি কিনি। আবার ঠকি। "ল অব ডিমিনিশিং রিটার্ণ" কাজই করে না। যখন একটু আধটু ছেড়ে একটু বেশিই লিখতে শুরু করলাম তখন "সাহিত্যের গৃহিণীপনা" বলে একটা কথা শুনেছিলাম। অর্থাৎ শুধু লিখলেই হবে না, তা গ্রন্থাকারে বা অন্য যেভাবে হোক পাঠকের হাতে যথোপযুক্ত(?) মূল্যে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা না পারলে যত ভালই লেখা হোক, কেউ পাবলিশ করবে না। নিজের জীবনে প্রত্যক্ষ্য করছি এটা। তা, এটা কি মার্কেটিং নয়? মার্কেটিং হল সেই প্রজাতির প্রাণী যা সিচুয়েশন অনুযায়ী নিজের রূপ ও স্বভাব পাল্টাতে পারে। এখন ব্যাপারটা আরো ঘোরালো হয়ে গেছে। কর্পোরেট হসপিটাল, মিডিয়া হাউস, কর্পোরেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এন জি ও প্রভৃতি সবাই একটা করে মার্কেটিং উইং রাখছে। "বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচ্যগ্র মেদিনী"। সবাইকে বাজার ধরতে হবে। হসপিটালে পেশেন্ট বেশি আনতে হবে, মিডিয়াতে বেশি বিজ্ঞাপন আনতে হবে, স্কুল কলেজে বেশি ছাত্র ছাত্রী আনতে হবে, এন জি ওকে বেশি সেবা প্রদান করতে হবে ইত্যাদি। লিস্ট বাড়ালেই বাড়বে। কত আর বলব! সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বাজার ধরার খেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কে হচ্ছে? এই খেলায় মাততে গিয়ে কোয়ালিটির সাথে, পরিষেবার সাথে কমপ্রোমাইজ করছি না তো আমরা? তা যদি হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনজীবন। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। প্রায়ই আমরা খবর পাই, দুটো বাসের রেষারেষিতে জানলার ধারে বসে থাকা এক ব্যক্তির হাত কেটে রাস্তা পড়ে গেছে। জোরে ছুটতে গিয়ে দুটো বাস এত পাশাপাশি এসে গিয়েছিল যে ঘষটানিতে এই দুর্ঘটনা। তা, বাস দুটো এমন বেপরোয়াভাবে ছুটছিল কেন? ঘুরেফিরে সেই মার্কেটিং। একই রুটের দুটো বাসকেই বাজার ক্যাপচার করতে হবে। মুনাফা লুটতে হবে। আমরা পড়েছিলাম, বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রথম দিকে কোন দ্রব্যের বাজার মূল্য দ্রব্যটি তৈরি করার খরচের থেকেও অনেকসময় কম রাখতে হয়। এখন ব্যাপারটা উল্টো বলে প্রতীয়মান হয়। প্রথমেই বেশি দামে দ্রব্য বাজারে নিয়ে এস, হেব্বি হেব্বি নায়িকাদের দিয়ে বিজ্ঞাপনে টিভির পর্দা কাঁপিয়ে দাও, প্রমাণ করে দাও এই বেশি দামে কেনাটাই স্ট্যাটাস সিম্বল। এর পরে পাবলিকে দ্রব্যটি খাবেই খাবে। পোস্ত এখন মহার্ঘ বস্তু। আগে মাসে এক কেজি পোস্ত যারা কিনত এখন মাসে একশ গ্রামে কাজ চালায়। দাম বেড়েছে মানে পোস্তর মান ভাল হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমার দোকানদার জানাল অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এক ধরনের শস্যবীজ পোস্তয় মিশিয়ে দিচ্ছে। কম পোস্ত বেচে বেশি লাভ। ওর কাছে আসল নকল দুটো পোস্তই আছে। আমি চাইলে নকলটা নিতে পারি। কিন্তু সেটা আমার শরীরের জন্য ঠিক হবে না। অাসলটার দাম একটু বেশি হলেও ওটাই নেওয়া ভাল। (মার্কেটিং এর সম্ভ্রান্ত নমুনা।) সুতরাং বেশি দামে পোস্ত কিনে পলিপ্যাকে নিয়ে সবাই কে দেখাতে দেখাতে বাড়ি ফিরলাম। এটাও মার্কেটিং। পোস্ত কিনেছি মানে, আমি অনেক বড় "হনু"। সেটা সবাইকে জানানো হল। আমার বাজার দর বাড়ল। টি আর পি বাড়াও আর মজায় থাকো। এই আদর্শে এখন চলছি আমরা। বলা ভুল হল। চলছি না, ছুটছি। হয়ত অপেক্ষায় আছি, ছুটতে গিয়ে কখন হোঁচট খেয়ে পড়ব। তারপর হয়ত পিঠদৌড় দিয়ে মূল স্রোতে ফিরব। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, আজ পর্যন্ত হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন কিছুই চিরস্থায়ী হয় নি।

news realisation Nikhil Kumar Chakraborty episode 16 marketing Durga puja shopping West Bengal India literature story উপলব্ধি সাহিত্যের পাতা

Last Updated :