চুমকী সূত্রধর
“মাতৃ দেব ভব, পিতৃ দেব ভব, আচার্য দেব ভব, অতিথি দেব ভব”- প্রায় ১৫০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে বৈদিক যুগে হিন্দু ধর্মের আদি শাস্ত্র হিসাবে বর্ণিত হয়েছিল বেদ। উপাসনা ও যজ্ঞ দ্বারা পরিচালিত নানা সাধনার দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিয়ম এবং প্রার্থনা মন্ত্র এতে পুঁথিবদ্ধ হয়েছিল। এটি হিন্দু তত্ত্বশাস্ত্রে বৃহৎ সংকলণ রুপে আজও চর্চিত এক বিষয়। চারটি ভাবে বিভক্ত এই পৌরাণিক শাস্ত্রে মোট মন্ত্রের সংখ্যা হল ২০৪৩৪ টি । চারটি ভাগ হল ঋগ্বেদ (সংস্কৃত স্তোত্রাবলীর সংকলণ), যজুবেদ (গদ্য মন্ত্রের সমাহার), সামবেদ (সংগীত ও মন্ত্রাবলী) ও অথর্ববেদ (অর্থ ও জ্ঞানের সমাহার)। প্রত্যেকটি বেদ আবার চারটি ভাগে বিভাজিত, যা হল সংহিতা; জন্ম দেয় মন্ত্র ও আশীর্বাচনের, আরণ্যক; ব্যাখ্যা দেয় ধর্মীয় আচার ও ক্রিয়াকর্মের, ব্রাহ্মণ বলে দেয় অনুষ্ঠান ও যজ্ঞাদির টীকা এবং উপনিষদ প্রমাণ দেয় ধ্যান, দর্শন ও আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনার। শুরুতে উল্লিখিত মন্ত্রটি বিরাজমান যজুবেদের তৈত্তীরীয় উপনিষদে যার অন্তর্নিহিত শ্রুতিমধুর তথ্যাবলী অজান্তেই জন্ম দিয়েছে ধর্মের না দেখা কিছু বক্তব্যকে।
পুরাণ মতে, অতিথি হল দেবতুল্য। অতিথির প্রকৃত অর্থ হল যে ব্যাক্তির আগমনে কোনো দিন ক্ষণের বিচার নেই। তার তুলনা হয় দেবতার সাথে, যেখানে দেবতা রূপে পূজার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতাব্দী নাগাদ আর্যরা ভারতবর্ষে আসে। তাদের দ্বারা পরিচালিত সমাজব্যাবস্থায় সমাজের যে চারটি ভাগ চোখে পড়ে তা হল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। যেখানে সমস্ত কিছুতেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণদের। পূজিত ছিলেন তাঁরা সমাজে পথ প্রদর্শক হিসেবে। “মাতৃ দেব ভব, পিতৃ দেব ভব, আচার্য দেব ভাব, অতিথি দেব ভব”- এর মধ্যে মাতৃ এবং পিতৃ বাদ পরলে বাকি দুটি বাক্য নির্দেশ করে দিয়েছে অতিথি ও ব্রাহ্মণ হলেন দেব তুল্য। হিন্দু ধর্মে চতুর্বর্ণ সমাজ ব্যাবস্থার ব্রাহ্মণ ছাড়া কেউ শিক্ষাদান করতে পারত না এবং আচার্য হতে পারত না। ব্রাহ্মণ ব্যতীত বৈশ্য ও শুদ্ররা কখনোই কারোর অতিথি হতে পারত না। ফলত এটা স্পষ্ট, পিতৃ ও মাতৃ ব্যতীত আচার্য অতিথি শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারত না। ফলত, শুধুমাত্রই জন্ম দিয়েছে বৈষম্য ও বিভাজনের।
সমাজে সে যুগে শক্তিশালী শাস্ত্র মনুসংহিতায় খুবই অনাবিল উল্লিখিত যে ব্রাহ্মণ বাড়িতে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র অতিথি হতে পারবে না। তবে, যদি তা হয়, তা হলে তাদের কাজের বিনিময়ে আহার গ্রহণ হবে বাড়ির চাকর-বাকরের সাথে। এমনকি, কোনো অনুষ্ঠানে যদি তাদের অতিথি হিসাবে আপ্যায়ন করা হত, তা হলে সেই অপরাধে একশতপন দেবার শাস্তির বিধানও উল্লেখ করা রয়েছে।
বর্তমানে সমাজের পরিবর্তনকালে কিছুটা অবস্থার উন্নতি হলেও ক্ষণে ক্ষণে বৈষম্যবাদ চাড়া দিয়ে ওঠে নানা বিবাদের কারণে। সংবিধান রচনাকালে “আচার্য দেব ভব” এই ভাবনা কিছুটা হলেও সংকীর্ণতা কাটিয়ে স্বাধীন রূপে উঠে আসলেও বহু জায়গায় বহু পরিস্থিতিতে স্কুল, কলেজের শিক্ষকগণ, পথ প্রদর্শকগণ মনুবীদদের নানান বিরোধিতার কারণে প্রকৃত সম্মান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থাকেন। সংবিধানের ১৭ নং ধারায় নিবন্ধ করা হয়েছে, মানুষের প্রতি অস্পৃশ্যতার দণ্ডতুল্য এবং সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ। ধারা ১২ হইতে ৩৫ অবদি নির্ধারণ করা হয়েছে জনগণের মৌলিক অধিকার সমূহ। তবুও, আজও ভিন্ন রূপে দাসত্ব, কাজের বিভাজন, বর্ণ বৈষম্য প্রত্যক্ষিত বিষয়। সমাজ বিবর্তনের নানান পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি পরিকল্পনা এবং অগ্রগতির চিহ্ন হিসাবে ‘অতিথি বেদ ভব’এবং 'অবিশ্বাস্য ভারত' ধ্যান ধারণা বৈদেশিক শিল্প এবং পর্যটকের আগমন আকর্ষণে ব্যাবহৃত হয়। কিন্তু, ২০১৪ সালের তৈরী পরিকল্পনা কেবল ফাইলেই থেকে গেছে। তার প্রকৃত প্রয়োগ এখনো চোখে পরেনি। এটা পর্যটন দপ্তরের দাবি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণ বৈষম্যের মাধ্যমে মানুষকে প্রতিনিয়ত হয়রানির স্বীকার হতে হয়। কখনো চুরির বদনাম, কখনো শারীরিক নির্যাতন আবার কখনো ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যদিও চুরি এবং খাদ্যাভ্যাসের অভিযোগ গুলি প্রমাণ করা জায়না। তাই প্রকৃত অর্থে “অতিথি দেব ভব” প্রয়োগে এখনো সমাজ পুরোপুরি ভাবে যে তৈরী নয় তার প্রমাণ চোখে পড়ে সমাজে অনবরত ঘটমান নানান অসহযোগিতার কারণে। ফলত, এই জিজ্ঞাস্য স্পষ্ট প্রতীয়মান, সবার ওপরে কি আদেও মানুষ সত্য ?
.jpeg)
