নিজস্ব সংবাদদাতা, উত্তরবঙ্গ: দুজন মানুষ, একজন মধ্যবয়স্ক আর একজন কার্যত বৃদ্ধ। এই দুই মানুষই কিছুক্ষন আগে হারিয়েছেন নিজেদের সবচেয়ে কাছের মানুষকে। একজন হারিয়েছেন মা, আর একজন হারিয়েছেন নিজের স্ত্রী কে। এহেন শোকের ধাক্কার মাঝেই কাঁধে করে সেই প্রান হীন মানুষটিকে নিয়ে হেঁটে চলেছেন পথের একপাশ ধরে। চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়ছে স্বজন হারানোর ঠাণ্ডা তরল। না, কোন শববাহী গাড়ি পাননি। কারন, তারা অর্থ দিতে অপারগ। বৃহস্পতিবার এহেন মর্মান্তিক অমানবিকতার দৃশ্যের সাক্ষি থাকল জলপাইগুড়ি।
{link}
মায়ের মৃতদেহ কাধে নিয়ে ক্রান্তির উদ্যেশ্যে পায়ে হেটে যাচ্ছে তার ছেলে ও স্বামী। অভিযোগ মাল মহকুমার ক্রান্তির ব্লকের বাসিন্দা পেশায় দিন মজুর রামপ্রসাদ দেওয়ান তার মা লক্ষ্মীরাণী দেওয়ানকে গতকাল রাতে জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করেন শ্বাসকষ্টের জন্য। রাতেই মারা যান লক্ষ্মীরাণী দেওয়ান৷ আজ সকালে মায়ের মৃতদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি এম্বুলেন্স ভাড়া করতে গেলে অভিযোগ ১০০০টাকা ভাড়ার জায়গায় হাসপাতালের থাকা এম্বুলেন্সের ভাড়া চাওয়া হয় ৩০০০হাজার টাকা। বেশ কয়েকবার কম টাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধও করেন রামপ্রসাদ। কিন্তু লোভ ও স্বার্থের মোড়ক ছেড়ে অসহায়তার পাশে এসে দাঁড়াতে চাননি কেউ। এতো টাকা দিতে না পেরে মায়ের মৃতদেহ কাধের নিয়েই পায়ে হেটে ক্রান্তির উদ্যেশ্যে রওনা দেয় রামপ্রসাদ দেওয়ান৷ পথেই এই দৃশ্য চোখে পরে জলপাইগুড়ি গ্রীন জলপাইগুড়ি নামক একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পাদক অঙ্গুর দাসের। সঙ্গে সঙ্গে তাদের শববাহী গাড়ি ডেকে সেই গাড়িতে মৃতদেহ তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। তারপর সেই শববাহী গাড়ি দেহ নিয়ে ক্রান্তির উদ্যেশ্যে রওনা দেয়৷
{link}
ঘটনার কারনে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে জলপাইগুড়ি জুড়ে। শুরু হয় দোষ ও লজ্জা চাপা দেওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টা। অভিযোগ অস্বীকার করা হয় অ্যাম্বুলেন্স কমিটির তরফ থেকে। পাল্টা দোষ চাপানো হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উপর। প্রশাসনের মন্তব্য, আমরা যোগাযোগ করেছি, আর যেন কোন অসুবিধা না হয় তা আমরা দেখব। কিন্তু এহেন চাপানউতোরের মাঝে মা হারানো রামপ্রসাদের কষ্ট বোধহয় কেউ বোঝার চেষ্টা করেননি। এক গরীব মা হারানো ছেলেকে ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে যে কষ্ট, যে অমানবিক পরিস্থিতির সাক্ষি হতে তা তো আর কোনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বিত্তজনের প্রয়াণে বড়ো নীল বাতি দেওয়া গাড়ি, ফুল-মালার ঢেউ… গরীবের প্রয়াণে মায়ের দেহ কাঁধে নিয়েই যাত্রা ছেলের, অর্থাভাবে পাশে নেই কেউ… এ কোন সমাজে বসবাস করছি আমরা? যে সমাজে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, চৈতন্যদেবের মতো মানুষেরা জন্ম নিয়েছেন এ মাটি সত্যিই সেই মাটি বলে আমরা বর্ননা করতে সক্ষম হব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে? হতে পারব তো?
{ads}