তথাগত ঘোষ, হাওড়া: সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে কলকাতার লক্ষ লক্ষ বাসিন্দার গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকির প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ,সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার দ্রুত বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জন্য জীবনে বড়সড় বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের আবহাওয়া, প্রকৃতি। প্রকৃতির পরিবর্তনে নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতাস পর্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
কিন্তু, সমস্যার বিষয় এই আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অত্যন্ত কম। একজন সাধারণ মানুষ কিংবা স্কুল পড়ুয়া কীভাবে প্রকৃতির এই পরিবর্তন সম্পর্কে বুঝতে পারবে, কিভাবেই বা ঠেকিয়ে দিতে পারবে সেই বিপদ? সেই সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও স্কুলপড়ুয়াদের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে একাই লড়াই করে চলেছেন হাওড়ার সৌভিক চোঙদার। শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছেন তাদের পরিবেশ পাঠের অবৈতনিক শিক্ষক। কিন্তু, সমস্যার বিষয় হল পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত এই লড়াইয়ে তিনি লড়ছেন একাই, নিজের জমানো অর্থ খরচ করে বাংলার বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় শিক্ষার আলো।
গত ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার কলকাতারা ন্যাশনাল হাই স্কুলে সৌভক করেছেন এবিষয়ক বিশেষ ক্লাস। সেই ক্লাসে হাজির ছিলেন সেই স্কুলের পড়ুয়া সহ কলকাতা, হাওড়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ২৬ টি স্কুলের একাধিক শিক্ষক। জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয়া বিপদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কীভাবে ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়গতভাবে প্রস্তুত হতে হবে, সেই বিষয়টি তিনি সকলের কাছে তুলে ধরেছেন সহজ ভাষায়।
একইভাবে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের দিন হাওড়ার এই তরুণ গিয়েছিলেন পাথরপ্রতিমায়। সেখানেও একাধিক স্কুলের ২০০ জন পড়ুয়াকে উদ্যোক্তারা হাজির করেছিলেন একটি কমিউনিটি সেন্টারে। সৌভিক সেই স্কুলে ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র, বাস্তুতন্ত্র। সেই ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে কীভাবে স্থানীয় মানুষজন নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন, তুলে ধরেছেন সেই সমস্ত তথ্যও। বিরুপ পরিস্থিতিতে স্কুল পড়ুয়া সহ এলাকার শিশু কিশোর, তরুণ তরুণীদের কী করা উচিত, তাও বুঝিয়ে বলেছেন সৌভিক। শিখিয়েছেন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিজেদের রক্ষা করার উপায়।
এই বিষয়ে একটি বইও লিখেছেন সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগের প্রাক্তনী সৌভিক। যা ইতিমধ্যেই সরকারি কর্তাদের নজর কেড়েছে। বইয়ে সৌভিক দেখিয়েছেন জলবায়ুর বিপদ সম্পর্কে কীভাবে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা সম্ভব। কিন্তু, সম্পূর্ণটাই তিনি করছেন নিজের খরচে। ইতিমধ্যেই নিজের টাকা খরচ করে প্রকৃতি রক্ষার বার্তা নিয়ে বহু আলোচনা ও পাঠচক্রে হাজির হয়েছেন সৌভিক। এবিষয়ে নিজস্ব ওয়েবসাইটেও লেখালেখি করেন তিনি। দেশি বিদেশি নানা পত্রপত্রিকাতেও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় জলবায়ু পরিবর্তন ও এটির বিপদ নিয়ে সৌভিকের লেখা। শিক্ষক দিবসে সুন্দরবনের পাথরপ্রতিমায় অনুষ্ঠিত প্রকৃতি শিক্ষা পাঠচক্রের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক অভিষেক কুমার তিওয়ারির সঙ্গে জলবায়ু শিক্ষা প্রসারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি। প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাড়ে তিনশো স্কুলে জলবায়ু শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সৌভিকের তৈরি একটি বিশেষ জলবায়ু শিক্ষার পরিকল্পনা পত্র জেলাশাসকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সুন্দরবনের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জীবিকা সংকটের মতো বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক জলবায়ু শিক্ষার কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সৌভিক চোঙদারের মতে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন আগামী প্রজন্মকে প্রস্তুত করে তোলার মতো কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা। তাঁর লেখা স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ ফর ক্লাইমেট এডুকেশন বইটি এই বৃহৎ উদ্যোগের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, নিজের অর্থ খরচ করে দীর্ঘ এই লড়াই আর কতদিন তিনি চালিয়ে যেতে পারবেন সেই নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন শিক্ষার্থীদের এই পরিবেশ বন্ধু। তাঁর কথায়, বিদ্যালয়, পরিবার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে 'জলবায়ু প্রহরী' তৈরি সম্ভব। এই প্রহরীরাই ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও কলকাতার জলবায়ু শিক্ষা শিবিরে আলোচনায় সৌভিক বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ জলবায়ু সহনশীলতা শুধু সরকারি নীতি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সচেতন সমাজ। যে সমাজের প্রতিটি সাধারণ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বুঝতে পারবেন এবং সেই অনুসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হবেন। এবিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা মানুষের কাছে না পৌঁছালে, আগামী দিনের কঠিন লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের অসহায় দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না।
