তথাগত ঘোষ: হাওড়া জেলার ইছাপুর। বর্তমানে ইছাপুর পরিচিত কলকারখানা এলাকা হিসাবেই। ইছাপুরের মাটিতে পা দিলেই নাকে আসবে লোহা-লক্কড়ের গন্ধ, কান পাতলেই শোনা যাবে হাতুড়ি-মেশিনের ঠোকাঠুকির শব্দ। যদিও একসময় এই এলাকায় ছিল বারুজীবী সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাস। উল্লেখ্য বিষয়, এই ইছাপুরেই অধিষ্ঠান করেন হাওড়া জেলার অন্যতম জনপ্রিয় শ্রীশ্রী দেবী শমী চণ্ডী। প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় একটি বিরাট মন্দিরে চলে দেবী চণ্ডীর এই বিশেষ রূপের আরাধনা। দেবীর মূর্তির আকারও বিশাল। কীভাবে হাওড়ার ইছাপুরে আগমন ঘটল দেবী শমী চণ্ডীর, কীভাবেই বা সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী? হাওড়ার এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কাহিনী রইল নিম্নলিখিত-
দেবী শমী চণ্ডীর পূজার ইতিহাস:
আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বা চারশো বছর আগে শুরু হয়েছিল দেবীর পূজা। কথিত আছে, আগে এই এলাকায় ছিল বারুজীবী সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাস। বারুজীবী অর্থাৎ পানচাষী। পান চাষ করেই নিজেদের জীবন অতিবাহিত করতেন স্থানীয়রা। কিন্তু, আচমকাই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েন পানচাষীরা। শমী পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে পান। ফলে, মাথায় হাত পড়ে চাষীদের। কোনওভাবেই এই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা।
সেই সময়েই এলাকাবাসীদের একজন দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশ পেয়ে প্রথম শুরু হয় দেবীর পুজো। চমকপ্রদভাবেই পুজোর পরেই শমীপোকার আতঙ্ক থেকে মুক্ত হন গ্রামবাসীরা। সেই সময় থেকেই স্থানীয়দের আরাধ্যা হয়ে উঠেছেন দেবী। শমী থেকেই, শমী চণ্ডী। বর্তমানে হাওড়া শহরে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও খ্যাতনামা পুজো হয়ে উঠেছে এটি। সময়ের সঙ্গে পুজোর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মায়ের দর্শনলাভের আশায়। ভক্তদেরও নিরাশ করেন না দেবী বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দেবী মূর্তির বৈশিষ্ট্য:
দেবী মূর্তির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এটিকে অন্যান্য প্রতিমার থেকে আলাদা করে তোলে। দেবীর চিবুকে আঁকা আছে ছোট একটি পানপাতা। একইসঙ্গে কপালে আঁকা রয়েছে শমীপোকা। মাথার উপর সর্বোচ্চে অবস্থান করছেন সিদ্ধিদাতা গণেশ। তাঁর নীচে দেবীর মাথার উপরেই রয়েছেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। দেবীর দুই পাশে অবস্থান করছেন দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবরাজ ইন্দ্র। তাদের মাথার উপরে অবস্থান করছেন দেবী জগদ্ধাত্রী। দেবীর পায়ের কাছে আছেন তাঁর পিতা মুনীরাজ। একইসঙ্গে নীচে রয়েছেন তাঁর দুই মেয়ে জয়া এবং বিজয়া। রয়েছেন ব্রহ্মা বিষ্ণু। বিগ্রহের মধ্যে উপস্থিতি রয়েছে রাম লক্ষণের। সঙ্গে মূর্তির মধ্যে নৃত্যরত অবস্থায় রয়েছেন মায়ের সখীরাও।
পূজার রীতিনীতি:
হাওড়ার রামরাজাতলার রাজা রামচন্দ্রের মতোই এই পুজোর সূত্রপাতও হয় বসন্ত পঞ্চমী তিথিতে অর্থাৎ, সরস্বতী পুজোর দিন। এই দিন হয় কাঠামোর বাঁশ পুজো। পরবর্তীতে সেই বাঁশকেই কাঠামোতে স্থাপন করে শুরু হয় মূর্তির নির্মাণকার্য। বাসন্তী পুজোর সময় চৈত্র সপ্তমী তিথিতে হয় দেবীর বোধন। রাম নবমীর আগেই মন্দিরে অধিষ্ঠাত্রী হন দেবী। রয়েছে বাতাসা দিয়ে পুজো দেওয়ার রীতি। এছাড়াও মন্দিরের শীতলা ভোগও জনপ্রিয়। শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার ভক্তদের কাছ থেকে বিদায় নেন দেবী।