নন্টে-ফন্টের মধ্যে আজ আর মজা ইয়ার্কি, ঠাট্টার সেই আবহ নেই... বাঁটুল কে জব্দ করার চেষ্টায় রত সেই দুই বালকও বদমাইশি ছেড়ে মনমরা হয়ে বসে এককোনে। কেল্টুও বদমাইশি ছেড়ে যেন মাঝ আকাশে তাকিয়ে কি একটা ভাবছে.... আজকে তাদের কারুরই মন ভালো নেই। কারন যে মানুষটির হাত ধরে তাদের সৃষ্টি, যার জন্য তাদের পরিচিতি, তিনিই যে আজ নেই। প্রয়াত হলেন বাংলা কমিকস জগতের রূপকার নারায়ন দেবনাথ। প্রয়ানকালে বসয় হয়েছিল ৯৬ বছর। বাঙালি আজ ফের তার এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে হারালো।
বেশ কয়েকদিন পূর্ব থেকেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। মঙ্গলবার সকাল সওয়া ১০টা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার মিন্টো পার্কের কাছে একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হন তিনি। হাসপাতাল সূত্রে খবর, মঙ্গলবার সকাল থেকেই হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা হচ্ছিল প্রবীণ এই কার্টুন শিল্পীর। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। তাঁর রক্তচাপ ওঠানামা করছিল। সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া দেননি নারায়ণ দেবনাথ। কষ্ট হচ্ছিল শ্বাস নিতেও। এই সময় তাঁর বাড়ির লোকজনকে খবর দেওয়া হয়।
১৯২৫ সালে হাওড়ার শিবপুরে জন্ম নারায়ণ দেবনাথের। অল্প বয়স থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল দেখার মতো। বাড়িতে অলঙ্কার তৈরির চল ছিল। ফলে শুরু থেকেই গয়নার নকশা তৈরি করতেন নারায়ণ দেবনাথ। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে বন্ধ হয়ে যায় আর্ট কলেজে পড়া। তার পর কয়েকটি বিজ্ঞাপন সংস্থার হয়ে কাজ করেন। তারপর তার অমর সৃষ্টির হাত ধরে বাঙালির নয়নমণি হয়ে ওঠেন।
{link}
নারায়ন দেবনাথ এমন একজন মানুষ, যাকে ছাড়া বাঙালি পাঠ্যসমাজ নিজের ছোট বেলা কল্পনাই করতে পারে না। কারন তার সৃষ্ট নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল শুধুমাত্র কোন কমিকস চরিত্র নয়, প্রতিটা বাঙালি ঘরের সদস্য, প্রতিটা শিশুর কাছের বন্ধু, আনন্দের চাবিকাঠি। শেষ জীবনে এসে ২০১৯ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন। তখন কেমন লাগছে প্রশ্ন করায় স্নিগ্ধ হেঁসে বলেছিলেন 'পুরস্কার পেতে... কার না ভালো লাগে!' উল্লেখযোগ্যভাবে তিনি বাঙালিকে যে পুরস্কার দিয়ে গেছেন তা হয়ত বাঙালি আজীবন বুকে করে আগলে রাখবে। গর্ব করে বলবে, আমাদের এক নারায়ন ছিল... যার সৃষ্টি প্রত্যেকটা শিশু সহ সমগ্র বাঙালির মনে মননে চিরস্থায়ী।
সত্যি বললে নক্ষত্ররা এইরকমই হন। মৃত্যুবরন করলেও নিজেদের আলোয় আলোকিত করে রেখে যান সমগ্র পৃথিবীকে। তবে খারাপ লাগার বিষয় এটাই যে বাঁটুল, নন্টে-ফন্টের কোন নতুন পর্ব আর প্রকাশিত হবে না। নিজের পরিচিত টেবিলে বসে আর কোন নতুন শিল্প পেনের কালির ছোঁয়ায় কাগজের উপর সৃষ্টি করাও হবেনা। তবে রয়ে যাবে তার সৃষ্টি। তার কলমে সৃষ্টি প্রতিটা মুহূর্ত, তার কলমে সৃষ্টি একটি অন্য জগৎ। তার হাত ধরেই তিনি অমর... তিনি অমর প্রতিটা বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে... তিনি অমর তার প্রতিটা সৃষ্টি করা চরত্রের অন্দরে।
