এ যেন বাস্তবের কৃষ্ণের জীবনের গল্প। জানকী ও যশোদা দুই মা ছিলেন কৃষ্ণের। এখানেও গল্পটা অনেকটা এইরকমই। এক মেয়ে, তার দাবিদার দুই মহিলা। দুই মহিলারই দাবি বছর তেরোরও ওই বালিকা থাকুক তাঁদের কাছে। এই দুই মহিলার দাবিও দুরকম। একজনের দাবি, তিনি বালিকার প্রকৃত মা। আর অন্যজনের দাবি, বারো বছর ধরে বালিকাটিকে লালনপালন করেছেন তিনি। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের ঘটনায় চাঞ্চল্য।
{link}
তাঁরা দুজনেই মা। দুজনেরই দাবি বছর তেরোর পিউ তাঁদেরই সন্তান। এক বালিকার মা কীভাবে হন দুজন? এর উত্তর পেতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে ২০০৮ সালের গ্রীষ্মের এক নিদাঘ দুপুরে। ভ্যান চালিয়ে চন্দ্রকোণা রাজ্য সড়ক ধরে ফিরছিলেন আজব নগরের দেবু দোলই। ময়রাপুকুর এলাকায় এক শিশুর কান্নার আওয়াজে সম্বিত ফেরে পথশ্রান্ত দেবুর। শব্দের উৎস সন্ধানে গিয়ে তিনি দেখেন, গাছের নীচে পড়ে রয়েছে ছোট্ট এক কন্যা সন্তান। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে শিশুকন্যাকে ঘরে নিয়ে আসেন দেবু। তুলে দেন স্ত্রীর কোলে। স্নেহময়ী এক মায়ের কোল পেয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ছোট্ট শিশু। শখ করে দেবুর স্ত্রী নাম দেন পিউ। গরিবের সংসারে সেদিন যেন উৎসবের মেজাজ। কুড়িয়ে পাওয়া পিউকে দেখতে দেবুর উঠোনে ভিড় জমে যায়। প্রতিবেশীদের কোলে কোলে হেসে খেলে বড় থাকে ‘কুড়ানি’। এদিকে পিউয়ের পরিবারের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেন দেবু ও তাঁর প্রতিবেশীরা। নাগাল না পেয়ে এক সময় হাল ছেড়ে দেন তাঁরা। হাঁটি হাঁটি পা পা ছেড়ে ছুটতে থাকে পিউ। দোলই দম্পতি ততদিনে বের করে ফেলেছেন পিউয়ের বার্থ সার্টিফিকেট। তৈরি করিয়েছেন আধার কার্ড। ভর্তি করে দিয়েছেন স্কুলে।
{link}
সব ঠিকঠাকই চলছিল। সমস্যা ঘটে কিছুদিন আগে। প্রায় এক যুগ পরে একদিন হঠাতই খড়ার পুরসভার বাসিন্দা জনৈক রকি সামন্ত ও তাঁর স্ত্রী ইতু পৌঁছে যান দেবুর বাড়িতে। তাঁদের দাবি, মানসিক সমস্যার কারণে বারো বছর আগে একদিন রাস্তার ধারে ছোট্ট মেয়েকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইতু। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড় হয় দোলই দম্পতির।
দুই পরিবারের টানাপোড়েনের জেরে হস্তক্ষেপ করতে হয় প্রশাসনকে। ঘর ছেড়ে পিউকে উঠে যেতে হয়েছে মেদিনীপুরের সরকারি হোমে। চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন দেবুর পরিবারের পাশাপাশি পড়শিরাও। পিউ আদতে কার, তার নিষ্পত্তি হয়নি এখনও। পিউকেই বা কতদিন হোমে থাকতে হবে, তা জানে না কৈশোরে পা দিতে যাওয়া মেয়েও। অলস বিকেলে বর্ষার মেঘমালার দিকে তাকিয়ে সেও ভাবে অধিকারটা আসলে কার, জন্মদাত্রী মায়ের, নাকি বারো বছর ধরে যে বুকে আগলে মানুষ করল সেই পালিকা মায়ের? পরিস্থিতির চাপে কার্যত চোখে জল সকলেরই। যেন চলছে কোন সিনেমার চিত্রনাট্য। বাস্তব জীবনের ছবি বলবে কে?
{}
